ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় অস্থির স্বর্ণের বাজার, এশিয়ায় কমছে গহনার চাহিদা

পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তজনা এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতার প্রভাবে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের ওঠানামা শুরু হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে দামের এ অনিশ্চয়তা ভারত ও বাংলাদেশের মতো ছোট বড় বাজারগুলোয় গহনার চাহিদাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। যুদ্ধের প্রভাবে একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন, অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতারাও চড়া ও অস্থির মূল্যের কারণে স্বর্ণ কেনা থেকে পিছিয়ে আসছেন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবং ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। খবর দ্য হিন্দু বিজনেস লাইন।

চলতি মাসের শুরু থেকেই স্বর্ণের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাজারে বড় ধরনের সংশোধন দেখা দিয়েছে। ইন্ডিয়ান বুলিয়ন জুয়েলার্স অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনের (আইবিজেএ) তথ্যানুযায়ী, মাত্র একদিনের ব্যবধানে ১০ গ্রাম স্বর্ণের দাম প্রায় ২ শতাংশ বা ৩৪ ডলার ৪০ সেন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৬ ডলার ৮১ সেন্টে। উল্লেখ্য, মার্চজুড়েই স্বর্ণের বাজারে ব্যাপক পতন লক্ষ করা গেছে। গত কয়েক সপ্তাহে ১০ গ্রাম স্বর্ণের দাম প্রায় ২৫৮ ডলার ৫৭ সেন্ট বা ১৫ শতাংশ কমেছে, যা মূলত বিশ্ব রাজনৈতিক অস্থিরতারই ফল।

স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার বাজারেও বড় ধস নেমেছে। ২ মার্চের তুলনায় কেজিপ্রতি রুপার দাম প্রায় ৭১৮ ডলার ৯৩ সেন্ট কমে ২ হাজার ৩৩৬ ডলার ৪৭ সেন্টে নেমে এসেছে। সাধারণত যুদ্ধের মতো সংকটের সময় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণকে সবচেয়ে নিরাপদ সম্পদ বা ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যে তেল উৎপাদনকারী স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় অনেক বড় বিনিয়োগকারী স্বর্ণ থেকে অর্থ সরিয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে খাটাচ্ছেন। ফলে শেয়ারবাজারের পাশাপাশি স্বর্ণের দামও বিশ্বজুড়ে নিম্নমুখী হয়েছে।

অল ইন্ডিয়া জেম অ্যান্ড জুয়েলারি ডোমেস্টিক কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অবিনাশ গুপ্ত বলেন, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এবং বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের অস্থিরতা স্বল্পমেয়াদে গহনার চাহিদাকে সংকুচিত করেছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‌ভারতীয় বা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ক্রেতারা ঐতিহ্যগতভাবেই স্বর্ণকে একটি ‘নিরাপদ সম্পদ’ হিসেবে দেখেন। তাই দাম যখন একটি নির্দিষ্ট স্তরে এসে স্থিতিশীল হবে, তখন আবারো বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এ শিল্পের ভিত্তি এখনো বেশ শক্তিশালী বলেই মনে করেন তিনি।

এ সংকটের পেছনে শুধু যুদ্ধই নয়, বরং মুদ্রার অবমূল্যায়নও বড় ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলারে উঠে যাওয়ায় দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মুদ্রার বিনিময় হার রেকর্ড পরিমাণে কমেছে। কোটাক সিকিউরিটিজের মুদ্রা ও পণ্য গবেষণা বিভাগের প্রধান অনিন্দ্য ব্যানার্জি জানান, ডলারের বিপরীতে রুপির বিনিময় হার ৯৪ দশমিক ৮০-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। স্থানীয় মুদ্রার এ দুর্বলতা স্বর্ণ আমদানির খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কমলেও স্থানীয় ক্রেতারা সে সুফল পুরোপুরি পাচ্ছেন না। চড়া আমদানি ব্যয়ের কারণে দেশটির বাজারে স্বর্ণের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে লজিস্টিক বা পরিবহন ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে দুবাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো থেকে আকাশপথে স্বর্ণ বা বুলিয়ন সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। এশিয়ার প্রধান বাণিজ্য পথগুলোতে উড়োজাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সরবরাহ সংকট কাটবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সময়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নিচ্ছেন, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। সব মিলিয়ে গহনা ব্যবসায়ী ও রফতানিকারকরা বর্তমানে একটি কঠিন সময় পার করছেন। বাজার স্বাভাবিক হতে আরো কিছুটা সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও